badhonmatrimony
0 1 min 8 mths

প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়ে নির্বাচন হলেই ছেলেপক্ষের এবং মেয়েপক্ষের নিকটতম লোকজন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বাগদান। বাগদান মানে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু। মেয়ের হাতের অনামিকা আঙ্গুলিতে বিয়ের-কন্যা-নির্বাচন প্রতীকচিহ্ন হিসেবে আংটি অথবা গলায় সোনার চেইন পরিয়ে পাকা কথা শেষ করা হয়। বর্তমানে ছেলেকেও মেয়েপক্ষের একজন অভিভাবক আংটি পরান।

গ্রামাঞ্চলের বনেদি কিংবা শহরের অভিজাত পরিবারগুলো মেহেদি সন্ধ্যা আলাদাভাবে করে থাকেন। পাত্র ও পাত্রীর হাতে মেহেদি নকশা করে তাদের আপন, চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো, ভাইবোনরা। বাড়িতে চলে কলের গান। খালা-চাচি-মামিরা তাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত আঞ্চলিক গান খালি গলায় পরিবেশন করে সন্ধ্যাকে আরও মুখরিত করে তোলেন।

বর-কনেকে সাজিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয়। কবুল কবুল কবুল সম্মতি উচ্চারণ, কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ বিবাহ নিবন্ধন ও উপস্থিত সবার প্রাণখোলা দোয়া মোনাজাত। কিংবা, যাজকের সামনে সম্মতি ধ্বনি বা, বৌদ্ধ ভিক্ষুর মঙ্গলবার্তা অথবা, অগ্নিকুণ্ড প্রদক্ষিণ ও উলুধ্বনির আবহে মালাবদল এবং পাত্রের হাতে রঙিন হয়ে ওঠা কন্যার সিঁথি এভাবেই খুশির জোয়ারে বিয়ের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে বাঙালি।

বিয়ে ছোট্ট একটি শব্দ কিন্তু এর গভীরতা ব্যাপক। আমাদের দেশের সব বিয়ের উৎসব ও আমেজ প্রায় এক ধরনের। তবে ধর্ম, সামাজ ও সম্প্রদায়ের নানা নিয়মের বেড়াজালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা ভিন্ন থাকে। চলুন জেনে নিই বিয়ের উৎসবগুলো সম্পর্কে।

কথাবার্তা

বিয়ের প্রাথমিক কথাবার্তা চলে মূলত ঘটকের মাধ্যমে। বর ও কনেপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে ঘটক। বর্তমানে কেউ কেউ আত্মীয়তার সূত্রে কখনো কখনো ঘটকের দায়িত্ব পালন করে। শহর এলাকায়, বিশেষত ঢাকায়, এখন ঘটকালির উদ্দেশে বেশ কটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তা ছাড়া বর্তমানে অনেকেই পূর্ব পরিচয়সূত্রে পরিণয়াবদ্ধ হচ্ছে। পেশাদার ঘটক না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাদেরকে বলা হয় ‘রায়বার’ বা ‘বিয়ের দালাল’ বা ‘উকিল’। এদের কাছ থেকে কনের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি সংগ্রহ করে নেয় কনেপক্ষ। গোপনে তারা বরের পরিবারের জাতপাত ও সহায়-সম্পদের খোঁজখবর নেয়। তারপর ঘটকের মাধ্যমে বাজারের হোটেলে বা অন্য কোথাও বরপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হবু বরকেও দেখা হয়। বর পছন্দ ও পরিবার মনঃপূত হলে পাত্রীপক্ষ ঘটকের মাধ্যমে কনে দেখার তারিখ জানিয়ে দেয়।

কনে দেখা

আপনি যাকে বিয়ে করবেন, বিয়ের আগে তাকে দেখতে হবে, তার সম্পর্কে জানতে হবে। এই দেখা ও জানাকেই বলা হয় ‘কনে দেখা’ বা ‘পাত্রী দেখা’। এটিও বিয়েকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি। এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী প্রচলিত।

প্রাচীনকালে বাংলার গ্রামসমাজে বর কর্তৃক কনে দেখার নিয়ম ছিল না। বরের অভিভাবকই কনে দেখতে যেতেন। অভিভাবক বলতে বাবা-মা, চাচা- জেঠা, বড় ভাই বা ভাবি। বিশেষত বরের বাবা-মা নিকটাত্মীয়দের নিয়ে কনের বাড়ি গিয়ে কনেকে দেখে আসত। কনে নির্বাচনপর্ব সম্পূর্ণভাবে অভিভাবকদের জ্ঞান, রুচি, অভিজ্ঞতা ও অভিমতের দ্বারা স্থির হতো। হিন্দু সমাজে ‘ছাত্নাতলা’র ‘শুভদৃষ্টি’র অনুষ্ঠানে এবং মুসলমান সমাজের ‘বাসর ঘরে’ বর-বধূ প্রথম পরস্পরকে দেখার সুযোগ পেত। এর আগে কোনো অবস্থাতেই নয়। অভিভাবকের পছন্দ-অপছন্দের ওপর বরকে রাখতে হতো পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা। তারা যাকে ইচ্ছা ছেলের বউ করে ঘরে তুলবে, বরের মতামতের কোনো গুরুত্ব ছিল না। রক্ষণশীল মুসলিম ও হিন্দু পরিবারে এখনো যে এমন নিয়ম চালু নেই তা নয়। আছে। তবে আগের তুলনায় কম। এখনো পরিচিতদের মধ্যে দু-চার জন পাওয়া যাবে যারা বাসর রাতের আগে স্ত্রীকে দেখার সুযোগ পাননি। তেমন একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘যার সঙ্গে সারা জীবন কাটাবেন, তাকে না দেখেই কবুল বলে ফেললেন?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘কী করব? বাবা-মায়ের বাধ্য সন্তান আমি। তাদের কথার বাইরে গিয়ে কোনোদিন কিছু করিনি। তারা যাকে পছন্দ করেছেন তাকে বিয়ে করা ছাড়া উপায় ছিল না।’

অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কনে দেখার নিয়মটাই উঠে যাবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বর-কনের কথা হবে। তারপর দেখা-সাক্ষাৎ হবে। পারস্পরিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটা সময়ে তারা পরিণয়ে আবদ্ধ হবে। এখনো কি তা হচ্ছে না? হচ্ছে। এই ব্যবস্থাটাও কি ঠিক? হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। আসলে সময়ই ঠিক-বেঠিক নির্ধারণ করে দেয়। প্রাচীনকালে যা ঠিক ছিল বর্তমানে তা বেঠিক মনে হচ্ছে। আবার বর্তমানে যা ঠিক ভবিষ্যতে তা বেঠিক মনে হবে। চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। সবই পরিবর্তনীয়।

ঘটকের মাধ্যমেই বর ও কনেপক্ষ কনে দেখা অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক করত। উনিশ-বিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজে কনে দেখা অনুষ্ঠানের একটা বর্ণনা দেওয়া যাক। অনুষ্ঠানটি হতো কনের বাড়িতে। উপস্থিত থাকত উভয়পক্ষের লোকজন এবং ঘটক। কনেপক্ষ তাদের আদরের মেয়েটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুজিয়ে বরপক্ষের লোকদের সামনে হাজির করত। কনের মাথায় লম্বা ঘোমটা। কথা বলে মৃদুস্বরে। বরপক্ষের লোকজন তাকে নানা প্রশ্ন করত। যেমন তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়? তোমার বাবার নাম কী? তোমরা কয় ভাইবোন? কোরআন পড়তে জান? সুরা ইয়াসিনের কয় মুবিন (অধ্যায়) মুখস্থ জান? একটা সুরা বল তো? ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করত কনে ঠিকমতো কথা বলতে পারে কি-না তা যাচাইয়ের জন্য। কোনো কোনো এলাকায় যাচাই করা হতো মেয়ের বুদ্ধিও। বরপক্ষ থেকে প্রশ্ন আসত, ‘তুমি কি দুই আনা দিয়ে একটি ঘোড়া, এক আঁটি লাকড়ি এবং একটি কাঠের বাক্স কিনে দিতে পারবে?’ মেয়ে বুদ্ধিমান হলে উত্তর দিত, ‘পারব।’ পাল্টা প্রশ্ন আসত, ‘কীভাবে?’ মেয়ের উত্তর, ‘একটা দেশলাই কিনে নেব আমি।’

এভাবেই মেয়েটিকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। যেন একটা ইন্টারভিউ বোর্ড। ইন্টারভিউতে পাস করলে বিয়ে, ফেল করলে বিয়ে নয়। বরপক্ষ শুধু প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত হতো না, মেয়ের চুল কতটা লম্বা বেণি খুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে হতো বরপক্ষকে। মেয়ে ল্যাংড়া কি-না তা দেখার জন্য হাঁটানো হতো তাকে। পায়ের নিচে পানি দিয়ে জায়গাটাকে পিচ্ছিল করে তাকে হাঁটতে বলা হতো। পরীক্ষা করে দেখা হতো পিচ্ছিল জায়গায় মেয়ে ঠিকমতো হাঁটতে পারে কি-না। হাতের কোষে পানি দিয়ে দেখা হতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে কি-না। মেয়ের দাঁতগুলো মুক্তার মতো ঝকঝকে, না আঁকাবাঁকা, দেখার জন্য হাঁ করতে বলা হতো মেয়েকে। পায়ের কাপড় সরিয়ে দেখা হতো দুই পায়ের পাতা। খুঁটিয়ে দেখা হতো আঙুলগুলো ঠিক আছে কি-না। গায়ের রঙ কালো, শ্যামলা, না ফর্সা, হাতের কবজি পর্যন্ত দেখিয়ে প্রমাণ দিতে হতো মেয়েকে। লেখাপড়া জানলে হাতের লেখা দেখার জন্য তার ঠিকানা লিখতে বলা হতো। ভালো রান্নাবান্না করতে পারে কি-না, কত রকমের আচার ও পিঠা বানাতে পারে, শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করতে পারবে কি-না এ ধরনের প্রশ্নও করা হতো। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, বরপক্ষের পছন্দ হলে মেয়ের হাতে গুঁজে দিত নগদ টাকা। কিংবা আঙুলে পরিয়ে দিত আংটি অথবা নাকে নাকফুল। তারপর শুরু হতো পান-চিনি বিতরণ পর্ব।

বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে কনে দেখার রীতিনীতির পরিবর্তন ঘটেছে। বিয়ের ক্ষেত্রে এখন ঘটকের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। পেশাগত ঘটক এখন নেই বললেই চলে। শিক্ষিতদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মীয়তার সূত্রে কখনো কখনো ঘটকের দায়িত্ব পালন করে। শহর এলাকায়, বিশেষত ঢাকায়, এখন ঘটকালির উদ্দেশে বেশ কটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এমনকি ঘটকালির জন্য ওয়েবসাইট পর্যন্ত খোলা হয়েছে। ছেলে- মেয়েদের ছবি ও পূর্ণ পরিচয়সহ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েও ঘটকালি করা হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে হয় এবং উদ্দেশ্য সফল হলে প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য পরিশোধ করতে হয়। সমাজ পরিবর্তনের এই ছোঁয়া গ্রামাঞ্চলেও পড়েছে। আগের মতো ঘটক আর দেখা যায় না। তাছাড়া বর্তমানে অনেকেই পূর্ব পরিচয়সূত্রে পরিণয়াবদ্ধ হচ্ছে। পেশাদার ঘটক না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাদেরকে বলা হয় ‘রায়বার’ বা ‘বিয়ের দালাল’ বা ‘উকিল’। এদের কাছ থেকে কনের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি সংগ্রহ করে নেয় কনেপক্ষ। গোপনে তারা বরের পরিবারের জাতপাত ও সহায়-সম্পদের খোঁজখবর নেয়। তারপর ঘটকের মাধ্যমে বাজারের হোটেলে বা অন্য কোথাও বরপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হবু বরকেও দেখা হয়। বর পছন্দ ও পরিবার মনঃপূত হলে পাত্রীপক্ষ ঘটকের মাধ্যমে কনে দেখার তারিখ জানিয়ে দেয়। হবু বর মিষ্টি-মিঠাই ইত্যাদি এবং সঙ্গে দুলাভাই, বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে কনের বাড়িতে যায়। মহাধুমধামে হয় ভূরিভোজ। ভোজনপর্বের পর কনে দেখার পালা। কনেপক্ষ যাতে কোনো ফাঁকিজুকি করতে না পারে সেজন্য সঙ্গে নেওয়া হয় দু-একজন নারী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্কে তারা বরের ভাবি বা বড় বোন। নারীরা কনের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে। পছন্দ হলে কনের হাতে আংটি পরিয়ে দেয়।

কনে দেখার বিড়ম্বনাও কম নয়। অনেকে আছে যারা দিনের পর দিন শুধু কনে দেখে বেড়ায়। বরের পছন্দ হলে কনের হয় না। কনের হলে বরের বাবা-মায়ের হয় না। ফলে কনে দেখা চলতেই থাকে। এমন মানুষও আছে আমাদের সমাজে, যারা শত কনে দেখেও নিজের স্ত্রী নির্বাচন করতে পারেন না। এদের অনেকের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করাও সম্ভব হয় না। মানুষ তাদের সন্দেহের চোখে দেখে।

বিজ্ঞাপন

কনে দেখার একটি খরচও রয়েছে। বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে কনে দেখার জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হয়। গাড়ি ভাড়া, মিষ্টি, উপহার ইত্যাদিতে প্রতিবারই খরচ হয়। ফলে যত বেশি কনে দেখা হবে ততই খরচ। এতেও এক পর্যায়ে হতোদ্যম হয়ে কনে দেখা ছেড়ে দিতে দেখা গেছে অনেক বিয়ের প্রার্থীকে। কারণ এর সাথে সাথে বয়স বেড়ে যায়। কোথাও কোথাও এমন খুঁতখুঁতে পাত্রের ক্ষেত্রে বাবা-মা একজনকে পছন্দ করে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেন। নয়তো ছেলে থেকে যায় অবিবাহিত।

প্রাচীনকালে কনে দেখার যেসব রীতিনীতির কথা বলা হলো সেসব কি এখন নেই? প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো প্রচলিত আছে। এগুলো ভালো কি মন্দ সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। রীতিনীতিগুলো ছিল এবং আছে। তবে আগের তুলনায় বহুলাংশে কমেছে। সমাজ বুঝতে পেরেছে কনের বাড়ি গিয়ে কনেকে দেখার এসব রীতিনীতির মধ্য দিয়ে নারীত্বের অপমান হয়। তাই তারা এসব রীতিনীতি বর্জন করতে শুরু করেছে। একুশ শতকের এই কালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন অনুষ্ঠান করে কনে দেখার দরকার হয় না। শহরে তো বেশিরভাগ বিয়ে হয় পাত্র-পাত্রীর পছন্দের ভিত্তিতে। বিয়ের আগেই তাদের মধ্যে প্রেম চলে। তাছাড়া এখন ফেসবুকের জামানা। কনেকে এখন তার বাড়ি গিয়ে দেখতে হয় না, ফেসবুকের মাধ্যমেই সবকিছু জানা সম্ভব।

অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কনে দেখার নিয়মটাই উঠে যাবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বর-কনের কথা হবে। তারপর দেখা-সাক্ষাৎ হবে। পারস্পরিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটা সময়ে তারা পরিণয়ে আবদ্ধ হবে। এখনো কি তা হচ্ছে না? হচ্ছে। এই ব্যবস্থাটাও কি ঠিক? হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। আসলে সময়ই ঠিক-বেঠিক নির্ধারণ করে দেয়। প্রাচীনকালে যা ঠিক ছিল বর্তমানে তা বেঠিক মনে হচ্ছে। আবার বর্তমানে যা ঠিক ভবিষ্যতে তা বেঠিক মনে হবে। চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। সবই পরিবর্তনীয়।

গায়ে হলুদ

কনে দেখা পাকাপাকি হলে বিয়ের সাত অথবা তিন দিন আগে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এটি মূলত বর ও কনে পক্ষ দ্বারা পালিত একটি অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কাচা হলুদ। বরপক্ষ বা কনেপক্ষের পক্ষ থেকে অপরপক্ষের আয়োজিত অনুষ্ঠানে নানান উপহারসামগ্রী পাঠানো হয় এ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি সাধারণত যে পক্ষ আয়োজন করে থাকে তারাই উপস্থিত থাকে। অপর পক্ষেরও দু-একজন অতিথি উপহার সামগ্রী নিয়ে এই আচারে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে বর বা কনেকে একটি পাটির উপর বসানো হয়। ছোট-বড় সবাই তার গালে বা হাতে হলুদ বাটা মাখিয়ে দেয়। সাথে বর বা কনের সামনে রাখা মিষ্টি জাতীয় দ্রব্যাদির কিছু অংশ তাকে তুলে দেওয়া হয়। গায়ে হলুদে যে উপকরণগুলো সাধারণত ব্যবহার করা হয় তা হলো-ডালা, কুলা, হলুদের বাটি, হলুদের পাটি, বেতের মাছডালা, মাছডালা, ঢাকনা, চন্দন, পালকি, সোহাগপুরি, চন্দন তেল, সোন্দা, মেহেদি, আপসান, মেহেদির তোয়ালে, হলুদের রুমাল।

মেহেদি তোলা

বিয়ে উপলক্ষে হাতে পায়ে মেহেদি মাখার রেওয়াজ হচ্ছে মেহেদি তোলা। সাধারণত মেহেদি গাছের কাঁচা পাতা বেটে মেহেদি মাখা হয়। মেহেদি পাতার সঙ্গে খয়ের, পোড়ামাটি ও কচুর ডাঁটা একসাথে চূর্ণ করে লেপা হয়। মেহেদি মাখা গতানুগতিক, কিন্তু মেহেদি তোলা সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক। বিয়ে আগের দিন ছোট ছোট মেয়েরা চিত্রিত কুলা বা ডালা নিয়ে দল বেঁধে বিয়ে বাড়ি থেকে যেখানে মেহেদির গাছ আছে সেখানে যায়। কুলায় থাকে পাঁচটি পান, পাঁচটি সুপারি ও মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য। মেহেদি তোলার আগে মেয়েরা গাছের চারপাশে কয়েকবার ঘুরে এসে কুলার দ্রব্যগুলি মেহেদি গাছকে উৎসর্গ করে। তারপর মেহেদি তোলে। এসব কাজের সাথে সাথে মেয়েরা গীত গায় ও নাচে। গীতগুলো এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রচিত।

বিয়ের স্নান

স্নান গায়ে হলুদের পরের অনুষ্ঠান। বিয়ের দিন শেষবারের মতো হলুদ মাখিয়ে স্নান করাতে হয়। অনুষ্ঠানটি ‘বর স্নান’ নামে পরিচিত হলেও একই উপলক্ষে কন্যার বাড়িতে কন্যারও স্নানের আয়োজন করা হয়। বরযাত্রার আগে বর স্নান, তেমনি কন্যা সাজানোর আগে কন্যা স্নান আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়। বর বা কনেকে ধান, দুর্বা, কাঁচা হলুদ ও আদা দিয়ে স্নান করানো হয়। এই স্নান উপলক্ষে সকালবেলায় কনের গা থেকে সমস্ত গহনা খুলে ফেলা হয়। তারপর তাকে একটি ঘরের মধ্যে পাটির উপর বসিয়ে রাখা হয়। বরকে অবশ্য এমন করা হয় না। তাকে কেবল স্নানের আগে একটা ঘরের মধ্যে কনের মতো পার্টির উপর বসানো হয়। দুপুরবেলা কনে বা বরের ভাবী, নানী অথবা দাদী একটা বাঁশের নতুন চালুনে ধান দুর্বা, হলুদ, সরিষার তেল, আদা ও মাটির প্রদীপ সাজিয়ে কনে বা বরের সামনে নিয়ে যায়। তার মুখের সামনে উঁচু করে ধরে। পরে তার হাত ধরে উঠানের একপাশে যেখানে স্নানের আয়োজন করা হয়েছে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। একটা বড় কাঠের পিঁড়িতে বসিয়ে স্নান করানো হয়। বর-কনেকে গোসল করানোর সময় একপ্রকার বিশেষ নাচের প্রচলন রয়েছে। বর-কনেকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী নারীরা এ নাচের আয়োজন করেন। তারা ধান, দূর্বা, পান, কড়ি ইত্যাদি দিয়ে বিয়ের নাচে অংশ নেন। এই ধরনের নাচে বিশেষ গানেরও প্রচলন রয়েছে।

বিয়ে

বিয়ের অনুষ্ঠানটিই বাংলাদেশের বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। কনেপক্ষ ও বরপক্ষ এখানে অতিথির মতো উপস্থিত হয়। অনুষ্ঠানে বরপক্ষ পরিবার-পরিজন, নিকটাত্মীয়, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের সমন্বয়ে গঠিত বরযাত্রী নিয়ে উপস্থিত হয়। সাধারণত অনুষ্ঠানে বর ও কনের জন্য আলাদা আলাদা স্থান থাকে। বর গিয়ে তার জন্য নির্ধারিত আসনে আসীন হয়। মুসলমানদের বিয়েতে এসময় একজন কাজীর দ্বারা ‘আক্বদ’ পড়ানো হয়। আক্বদ হলো বর ও কনের পারস্পরিক সম্মতি জানার সামাজিক প্রক্রিয়া। প্রথমে বর ও কনেপক্ষের মুরব্বিদের উপস্থিতিতে বিয়েতে কনের সম্মতি জানা হয় এবং পরে একই কাজীর দ্বারা বর ও কনেপক্ষের মুরব্বিদের উপস্থিতিতে বরের সম্মতি জানা হয়। এভাবে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

এরপর শুরু হয় ভোজনপর্ব। বিয়ের ভোজন শুরু করা হয় বরের ভোজন দিয়ে। বরের জন্য এজন্য বিশেষভাবে আলাদা একটি বড় থালাতে খাবার সাজানো হয়। এই থালাতে পরিবেশিত খাবার অধিকাংশ সময়েই অপচয় হয়। স্রেফ সৌন্দর্যের জন্য পালন করা হয় এই রীতি। এছাড়া উপস্থিত বর ও কনেপক্ষের অতিথিদের জন্য আলাদাভাবে খাদ্য পরিবেশিত হয়। খাদ্য তালিকায় সাধারণত উচ্চক্যালরিযুক্ত খাবার থাকে। যেমন পোলাও, মুরগির রোস্ট, কোরমা, কাবাব, রেজালা। মিষ্টিজাতীয় খাবারের মধ্যে থাকে দই, পায়েশ, জর্দা। হজম সহায়ক খাদ্যের মধ্যে থাকে বোরহানী ইত্যাদি। এছাড়া কোনো কোনো বিয়েতে সাদা ভাত ও কোমল পানীয়েরও ব্যবস্থা থাকে।

হিন্দুরীতির বিয়েতে অন্যান্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মূল কার্যক্রম হয় সাতচক্কর বা সাতপাক। এজন্য মন্ডপের মধ্যিখানে একটি অগ্নিকু- তৈরি করে বর ও কনে উভয়ের পরিধেয় কাপড়ের একটা অংশ একত্রে গিঁট দিয়ে নেন এবং আগুনকে ডানে রেখে সাতবার চক্কর দেন বা ঘুরে আসেন। এভাবেই বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

বিদায়পর্ব

বিয়ের ভোজন পর্ব শেষ হলে বরকে নিয়ে যাওয়া হয় কনের কাছে এবং দুজনকে একত্র করে বসানো হয়। বর কনেকে এবং কনে বরকে মিষ্টি খাওয়ায়। আরো কিছু আচার পালন শেষে আসে বিদায় পর্ব। কনেকে বরের হাতে তুলে দেন কনেপক্ষ। বরপক্ষ কনেকে নিয়ে বেরিয়ে আসে অনুষ্ঠানস্থল থেকে। রওনা হয় নিজের বাড়ির দিকে। এসময় কনেপক্ষের মধ্যে অশ্রসজল মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।

বৌভাত

হিন্দু-মুসলমানসহ সব সমাজেই বিয়েতে বরের বাড়িতে বৌভাতের প্রচলন রয়েছে। এটি মূলত খাওয়া-দাওয়ার উৎসব। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী খাওয়ার আয়োজন করা হয়। সাধারণত বিয়ের পরের দিন অথবা তিন দিনের দিন বৌভাত অনুষ্ঠিত হয়। কন্যাপক্ষের লোকদের আগেই দাওয়াত দেওয়া থাকে। তারা ও বরপক্ষের নিমন্ত্রিত অতিথিরা একসঙ্গে খানাপিনা সম্পন্ন করে। হিন্দু সমাজে ওইদিন নববধূকে প্রথম রান্নাঘরে নেওয়া হয় এবং তার হাতের স্পর্শযুক্ত রান্না খাইয়ে তাকে বরের সমাজভুক্ত করা হয়।

বরন্তা

সাধারণত বিয়ের পর তিন দিনের দিন কনেপক্ষের লোক বরের বাড়িতে আসে কনে ও জামাইকে নেওয়ার জন্য। এদের বিশেষভাবে সমাদর করতে হয় ও ঘটা করে খাওয়াতে হয়। গৃহকর্তা খরচ বাঁচানোর জন্য বরন্তা ও বৌভাত একসঙ্গে করতে পারেন। আবার পারিবারিক ঐতিহ্য ও দম্ভ প্রকাশের জন্য আলাদাভাবেও করতে পারেন। বরন্তা একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। হিন্দুসমাজে একে ‘দ্বিরাগমণ’ বলা হয়। এটিই কনের প্রথম নাইওর।

মেলানি

এটিই বিয়ের শেষ অনুষ্ঠান। হিন্দু সমাজে ‘অষ্টমঙ্গলা’ অনুষ্ঠান পালিত হয় বিয়ের অষ্টম দিনে কনের বাড়িতে। ওইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বর-কনের ‘গাঁটছড়া’ ‘মঙ্গলসূত্র’ ইত্যাদি খোলা হয়। চতুর্থ দিন অথবা দশম দিনেও এটি পালিত হতে পারে। তখন এটি ‘চতুর্থমঙ্গলা’ বা ‘দশমমঙ্গলা’ নামে অভিহিত হয়। ঢাকা জেলায় মুসলমান সমাজে একই উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ‘আড়াই উল্লা’ নামটি পাওয়া যায়। দ্বিরাগমনের পর আড়াই দিনের মাথায় বর কনেকে নিয়ে নিজগৃহে ফিরে আসে। ওইদিন বরকে কনের বাড়িতে মাছ, দই ও মিষ্টিদ্রব্য দিতে হয়। মাছ না দেওয়া পর্যন্ত অভিভাবক মেয়ে-জামাইকে মাংস দিয়ে পল্লান্ন খাওয়াবেন। অনুষ্ঠান শেষে বর-কনেকে বিদায় দিতে হয়। একে মেলানি বলে। বিদায় শব্দটি অশুভসূচক, এজন্য বিদায় অর্থে মেলানি বলা হয়। বর-কনের বিদায়যাত্রা শুভ হোক, তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এটাই হচ্ছে মেলানির কামনা।

ধর্মভেদে বিয়ের রীতিনীতি

মুসলিম বিবাহ উৎসব:

ধর্মের ব্যাখ্যাতে মুসলমানদের বিবাহ আর ওয়ালিমা ছাড়া আর তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। হাঁটি হাঁটি পা পা করে সময় এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী লোকাচার ও সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছে। গ্রাম ও শহরের মানুষ এখন বেশ কয়েকটি উৎসব রীতিমতো পালন করে যাচ্ছেন। এগুলোর মধ্যে- পাত্র-পাত্রী দেখা : মুসলিম সমাজে এখন রীতিমতো পাত্র-পাত্রী দেখা চলছে। সমাজ, সংস্কৃতি, অঞ্চল, শিক্ষা দেখে উভয় উভয়কে পছন্দ করছেন। এটি চলে আসছে আধুনিকের প্রারম্ভ থেকেই।

• বাগদান: পাত্র-পাত্রীর পছন্দের চিহ্ন স্বরূপ স্বর্ণ পরিয়ে পরিবারের সম্মতি সাপেক্ষে দিন তারিখ নির্ধারণ করা হয় বাগদানের দিন।

• মেহেদি সন্ধ্যা ও গায়ে হলুদ: ঘরে ঘরে এখন মেহেদি সন্ধ্যা করা হয়। বন্ধু-বান্ধবের আনাগোনা, প্রতিবেশীর ফুর্তি আর স্বজনদের বিয়ে ব্যস্ততায় উদযাপিত হয় মেহেদি। হলুদে নাচ, গান আর অভিনয়ের মাঝে উৎসব আরও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে।

• আখত: অনেক পরিবারই বিয়ের পর্বটা আগেভাগেই করে রাখেন। এটিই আখত। পরে উপযুক্ত সময় বুঝে বিয়ের অনুষ্ঠান করে থাকেন।

• বিয়ের অনুষ্ঠান: এটি প্রধান অনুষ্ঠান। শেরওয়ানি, শাড়ি বা লেহেঙ্গায় রাজা-রানীর বেশে কন্যাদানের মাধ্যমে পালিত হয় বিয়ের অনুষ্ঠান।

• ওয়ালিমা: বরপক্ষের এ বড় আয়োজনের মাধ্যমে বন্ধু, স্বজন ও এলাকাবাসীকে দাওয়াত দিয়ে করা হয় ওয়ালিমা বা বউভাত অনুষ্ঠান।

হিন্দু বিবাহ উৎসব:

আবহমানকাল থেকে হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় বিয়ের রীতিনীতি চলে আসছে। হিন্দু ধর্মের বিয়ে বেশ কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

• পাটিপত্র: বাগদান অনুষ্ঠানে পাটিপত্র করা হয়। এই পাটিপত্র উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে পুরোহিত লেখেন। পাটিপত্রে বর-কনের স্বাক্ষর থাকে। এরপর কোনো পক্ষের অসম্মতি প্রকাশ করার সুযোগ থাকে না। তবে আধুনিক সময়ে অনেকে পাটিপত্র করছেন না। এরপর আসে আশীর্বাদ আসর। এর প্রধান উপকরণ ধান, দুর্বা, প্রদীপ, চন্দন, পান, সুপারি ও বড় মাছ। পঞ্জিকা অনুসারে শুভদিন দেখে আশীর্বাদ করা হয়।

• পানখিল, দধিমঙ্গল ও গায়ে হলুদ: গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের জন্যও দিনক্ষণ আছে। এখানেও শুভ দিনক্ষণ দেখে গায়ে হলুদের জন্য হলুদ কোটা হয়। পাঁচ-সাত জন সধবা স্ত্রীলোক মিলে হলুদ কোটেন। এ হলুদই পরে গায়ে হলুদের দিন গায়ে হলুদ দেয়া হয়। গায়ে হলুদের আগের দিন আরশি দেখা হয়। সাধারণত পাত্র-পাত্রী জরুরি কোনো কাজ না থাকলে অমঙ্গলের কথা ভেবে বাহিরে যান না।

• বরবরণ, সাতপাক, শুভদৃষ্টি, মালাবদল, সম্প্রদান ও অঞ্জলি: গোধূলির শেষ লগ্নে অর্থাৎ সন্ধ্যার পর যখন রাত গড়ায় তখন বর বরণ শুরু। অনুষ্ঠান দুই পর্বের। একটি সাজ বিয়ে, অন্যটি বাসি বিয়ে। দুটি আসরই কনের বাড়িতে বসে। তবে কোনো কোনো সময় বাসি বিয়ে বরের বাড়িতেও হয়ে থাকে। সাজ বিয়ে বিয়ের মূলপর্ব। এ পর্বেই কনে আর বরকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে বরণ করে নেয়। বরণ শেষে বর-কনে দু’জনের দিকে শুভ দৃষ্টি দেয়, একই সময় মালা বদল করা হয়। পরে পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করে বর-কনের ডান হাত একত্রে করে কুশ দিয়ে বেঁধে দেন।

• সিঁদুরদান: এরপর সিঁদুর দান বা বাসি বিয়ের পর্ব। বাসি বিয়েতে বিভিন্ন দেবদেবীর অর্চনা শেষে বর কনের কপালে সিঁদুর দিয়ে দেন। তারপর উভয় মিলে সাতবার অগ্নি দেবতা প্রদক্ষিণ করেন।

• বউ ভাত: বউ ভাত অনুষ্ঠান বরপক্ষ অনেক ঘটা করে পালন করেন। বাড়ির বউকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় এই অনুষ্ঠানে।

খ্রিস্টান বিবাহ উৎসব:

খ্রিস্টান সমাজেও সাধারণত প্রথমে পাত্রী দেখা হয়। বরপক্ষ কনে নির্বাচন করে কনের চরিত্র, দোষ-গুণ, বংশ পরিচয় জেনে নেন। পরে শুভদিন দেখে শুভকাজ করা হয়।

• কনে নির্বাচন ও বাগদান: বরপক্ষের প্রস্তাবে কনেপক্ষ রাজি হলে বাগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় এ অনুষ্ঠানকে পাকা দেখাও বলে। অনেকে এ অনুষ্ঠানকে পানগাছ অনুষ্ঠান বলেন। বাগদান উপলক্ষে পান, সুপারি, বিজোড় সংখ্যক মাছ নিয়ে যাওয়া হয় বলেই এ নাম ধারণা করা হয়।

• বরপক্ষের লোকজন কনের বাড়িতে যায়। যা আগেই কথা বলে ঠিক করে রাখা হয়। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত বর-কনে সবার আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। বিয়ের তিন সপ্তাহ আগে কনের বাড়িতে পুরোহিতের কাছে বর-কনে নাম লেখান। অনেকে এ অনুষ্ঠানে আতশবাজি ও বাজনার আয়োজন করেন।

• বান প্রকাশ, অপদেবতার নজর ও কামানি বা গা-ধোয়ানি: এই অনুষ্ঠানে বর-কনে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। মণ্ডলীর বিধি অনুযায়ী এ সময় বিয়ের ক্লাস করতে হয়। এটি বিয়ে পূর্ব বাধ্যতামূলক ক্লাস ব্যবস্থা। নাম লেখা থেকে শুরু করে বিয়ের আগ পর্যন্ত বর ও কনেকে অতি সংযমী জীবন করতে হয়।

• কনে তোলা: বিয়ের দিন ভোরে বাদকদলসহ বরের আত্মীয়-স্বজন কনের বাড়ি গিয়ে কনেকে নিয়ে আসেন। কনেকে ঘর থেকে আনার সময় তার হাতে পয়সা দেয়া হয়। কনে বাড়ি থেকে আসার সময় সেই পয়সা ঘরের মধ্যে ছুড়ে ফেলে। এর অর্থ হল যদিও সে বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছেন, তারপরও বাড়ির লক্ষ্মী ঘর থেকে চলে যাচ্ছে না।

• গির্জার অনুষ্ঠান: শুরুতে গির্জার প্রবেশ পথে যাজক বর-কনেকে বরণ করে নেন। তারপর বর-কনে দু’জনের মধ্যে মালাবদল করা হয়। এরপর কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়া হয়।

• ঘরে তোলা: এ অনুষ্ঠানে উঠানের দিকে মুখ করে বড় পিঁড়ির উপরে বর-কনেকে দাঁড় করান হয়। এরপর বর-কনে সাদা-লাল পেড়ে শাড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ঘরে ওঠে। এ সময় বর ও কনে একে অপরের কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধরে থাকেন।

বৌদ্ধ বিবাহ উৎসব:

ধর্মীয় ও সামাজিক এই দুই দিকের প্রাধান্য দিয়ে বৌদ্ধ বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে থাকে।

• পাকা-দেখা: পাকা দেখার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় বিয়ের কথা। পাত্র-পাত্রী উভয়কে দেখে অভিভাবকের মাধ্যমে পাকা কথা ও দিন ধার্য করা হয়।

• গায়ে হলুদ: বাঙালি সংস্কৃতির সব ধর্মেই এখন গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্মেও গায়ে হলুদ হয়।

• বিবাহ অনুষ্ঠান: সামাজিকভাবে সবাইকে নিয়ে ধর্মীয় রীতি ঠিক রেখে বৌদ্ধ বিহারে পাত্র-পাত্রীকে নিয়ে আসা হয়। এখানে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধের পূজা করা হয়। ত্রি স্মরণ পঞ্চশীল পূজার মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুকের আশীর্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

• বউ ভাত: বিবাহোত্তর সামাজিকভাবে প্রতিবেশী, পরিজন নিয়ে আয়োজন করা হয় বরপক্ষের বউ ভাত অনুষ্ঠান। রঙিন উৎসবে নাচ গানে আনন্দমুখরতায় পালন হয় বউ ভাত।

আদিবাসীদের বিবাহ উৎসব:

বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী গোষ্ঠী বসবাস করছে। তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা বিয়ের রীতি রয়েছে।

এদের মধ্যে চাকমা, মারমা, মণিপুরি, গারো ও সাঁওতালসহ অনেক আদিবাসীরা তাদের নিজ নিজ সাম্প্রদায়িক রীতিনীতি ও অনুশাসন মেনে উদযাপন করছেন বিবাহ উৎসব।

মূলত, ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়ের বিবর্তন ভেদে বাঙালির সব ধর্মের ও সম্প্রদায়ের নানা লোকাচারে পালিত হচ্ছে বিবাহ উৎসব।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *