Badhon Blog
badhonmatrimony

দোয়া কবুল না হয় না কেন?

’দোয়া’ আরবি শব্দ। এর অর্থ- ডাকা, আহ্বান করা, প্রার্থনা করা, কোনো কিছু চাওয়া ইত্যাদি। দোয়া ইবাদতের মূল, দোয়া হলো মুমিনদের হাতিয়ার। রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করার মাধ্যমে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। প্রার্থনা ছাড়া আর কোনো কিছুই আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তকে বদলাতে পারে না। সর্বাবস্থায় যারা মহান আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। রাব্বুল আলামিন আমাদের সব দোয়াই কবুল করেন। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের নিজস্ব কিছু ভুলের কারণে দোয়া কবুল হয় না। আজকে আমরা সেসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করবো।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্‌ পাক বলেন-

‘তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করবো’। (সুরা মুমিনঃ ৬০)

বিপদ-আপদ ও বিভিন্ন সমস্যায় আল্লাহ্‌ পাকের সাহায্য কামনা করতে তিনি নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-

‘আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই’ (সুরা ফাতিহাঃ ৪)

হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেছেন-

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র নিকট কিছু চায় না, আল্লাহ্‌ তাআলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন।’

হজরত সালমান ফারসি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেছেন-

দোয়া ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু তাকদিরের লিখনকে ফেরাতে পারে না এবং নেক আমল ছাড়া অন্য কোনো বস্তু হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে না। তাকদিরের ফয়সালাকে কেবল দোয়াই পরিবর্তন করতে পারে।’

যেসব কারণে দোয়া কবুল হয় না

ইবাদতের সময় বা ইবাদতের বাইরে, চলতে-ফিরতে আমরা আল্লাহ্‌র কাছে অনেক দোয়া করি। রাব্বুল আলামিন ওয়াদা করেছেন, প্রার্থনা করলে তিনি তা গ্রহণ করবেন। কিন্তু দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দোয়া কবুল হয় না। আজকের পোস্টে আমরা দোয়া কবুল না হওয়ার কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

খাবার, পানীয় ও পোশাক হালাল না হওয়া

দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে সবসময় হালাল খাদ্য, পানীয় এবং কাপড় পরিধান করা। যে ব্যক্তি হারাম উপার্জনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে, সে যতই দোয়াই করুক না কেন, মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে তা কবুল হবে না। রাসুল (সা) বলেন-

’মানুষের ওপর এমন এক যুগ অবশ্যই আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে কিভাবে সে সম্পদ অর্জন করল, হালাল উপায়ে, নাকি হারাম উপায়ে!’

অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা) ইরশাদ করেন-

’হে মানব সকল! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না।’

এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আ) বলেন-

’তোমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ চায় যে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, তাহলে সে যেন হালাল অর্থ উপার্জন করে এবং নিজকে ঋণ মুক্ত করে।’

সুতরাং কোনো ব্যক্তি দোয়া করলে তা কবুল না হওয়ার পিছনের একটি কারণ হতে পারে সেই ব্যক্তি হয়তো এমন কোন কাজ করছেন যা আল্লাহ্‌ তায়ালা নিষেধ করেছেন। হতে পারে তার উপার্জিত সম্পদ হারাম, তিনি হারাম চাকরি করেছেন, এবং হারাম পোশাক বা বাসস্থান ব্যবহার করছেন। অথবা তিনি বিদআত অনুসরণ করেন।

দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করা

যে ব্যক্তি পূর্ণ মনোযোগ না দিয়ে দোয়া করে বা উদাসীনভাবে আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে, তার দোয়া কবুল হয় না। যিনি দোয়া করছেন তার অন্তরের সাথে নিয়তের মিল থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আ) বলেন-

‘মহান রাব্বুল আলামিন কখনো অন্যমনস্ক অন্তরের প্রার্থনা কবুল করেন না। তাই যখন তোমরা কোনো দোয়া করবে, অন্তর থেকে তা বের করবে, অতঃপর কবুল হওয়ার প্রতি আস্থাবান হবে।’

রাসুল (সা) বলেছেন-

’যখন তুমি দোয়া করবে, দোয়া কবুল হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করবে। জেনে রাখো, আল্লাহ কোনো অমনোযোগীর দোয়া কবুল করেন না।’

অনেকে আছে যারা দোয়া করার পর ফলাফল লাভের জন্য তাড়াহুড়া শুরু করে। আবার দ্রুত ফলাফল না পেলে হতাশ হয়ে পড়ে। এমনকি এ রকমও অভিযোগ করা শুরু করে দেয়, ”এতো দোয়া করলাম, কই আল্লাহ্ তো দোয়া কবুল করলেন না। আল্লাহ মনে হয় আমাদের কথা শুনেন না।” রাসুল (সা) বলেন-

‘তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়ে থাকে। যদি সে তাড়াহুড়া না করে এবং এ কথা না বলে যে আমি দোয়া করলাম, কিন্তু আমার দোয়া তো কবুল হলো না।’

কেউ যদি এমন কথা বলে তাহলে শাস্তিস্বরূপ সত্যিই আল্লাহ্‌ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন না। এইজন্য ধৈর্য ধরে দোয়া করতে হবে। দোয়া করার ক্ষেত্রে কখনো ফলাফল পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না এবং ফলাফল পেতে দেরি হলে আল্লাহ্‌র সাথে নাফরমানি করা যাবে না।

আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে দোয়া কবুল হবে না

আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা একটি জঘন্য পাপ। এই পাপের শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই ভোগ করতে হবে বলে কুরআন ও হাদীসে বলা হয়েছে। রাসুল (সা) বলেন-

’কোনো মুসলিম দোয়া করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের দোয়া না করলে অবশ্যই রাব্বুল আলামিন হয়তো তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সুপারিশ দুনিয়ায় দান করবেন, অথবা তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন, অথবা তার কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদ তার থেকে দূরে রাখেন।’

আল্লাহ্‌ পাক দোয়া করলে সাথে সাথে কবুল না করে প্রার্থিত বস্তুর চেয়েও অধিক দেওয়ার জন্য রেখে দেন।

পাপকাজ থেকে বিরত না থাকা

দোয়া কবুল না হওযার আরেকটি কারণ হলো পাপকাজ থেকে বিরত না থাকা এবং শরীয়তসম্মতভাবে জীবনযাপন না করা। গুনাহের কারণে অনেক মানুষের দোয়া মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে পৌঁছায় না। আপনি ক্রমাগত আল্লাহ্‌ পাকের দরবারে দোয়া করছেন কিন্তু সাথে সাথে ক্রমাগত পাপ করে যাচ্ছেন। গুনাহ করার পর তওবা না করলে রাব্বুল আলামিন দোয়া কবুল করেন না। আর দোয়া করার সময় অবশ্যই শিরকমুক্ত হয়ে দোয়া করতে হবে।

দোয়া কবুল হওয়ার জন্য মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে হবে। রাসুল (সা) বলেন-

‘‘শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ দিবে ও অন্যায় কাজ হতে বাধা প্রদান করবে। নতুবা, অচিরেই এর ফলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়ায় সাড়া দেওয়া হবে না।’’

শুধুমাত্র বিপদে-আপদের সময় দোয়া করা

দোয়ার মাধ্যমে যেমন বিপদ-আপদ দূর হয়, তেমনি ভবিষ্যতে বিপদ-আপদ আসাও বন্ধ হয়। এজন্য শুধুমাত্র বিপদ-আপদের সময় নয় বরং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ও দোয়া করা উচিত। অর্থাৎ বিপদ-আপদ দূর হলে রাব্বুল আলামিনের দরবারে শুকরিয়া জানানো উচিত। সুখের সময়ে প্রচুর সময় নিয়ে দোয়া করা ভালো। রাসুল (সা) আল্লাহ্কে সুসময়ে স্মরণ করতে বলেছেন। এতে করে রাব্বুল আলামিন আমাদের কষ্টের সময় দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ্‌। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেন-

‘যে ব্যক্তি চায় যে দুঃখের সময় যেন আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন, তবে সে যেন সুখের সময় অধিক পরিমাণে দোয়া করে।’

মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এমন এক শ্রেণীর মানুষের পরিচয় দিয়েছেন যারা শুধুমাত্র বিপদে পড়লেই তাঁর দরবারে দোয়ার হাত তোলে। মহান আল্লাহ্ বলেন-

’আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দেই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয়, কখনো কোন কষ্টেরই সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি।’ (সুরা ইউনুসঃ ১২)

অতএব আরেকটি কারণ হচ্ছে সুসময়ে আল্লাহ্‌ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা।

দোয়ার সাথে কর্ম ও প্রচেষ্টার সংযোগ না থাকা

প্রার্থনা একটি ইবাদত। ইবাদত করতে হয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। আর ইবাদত করতে হয় ইখলাসের সঙ্গে। ইখলাস না থাকলে মহান আল্লাহ্‌র কাছে সে ইবাদত মূল্যহীন। তাই পরিপূর্ণ ইখলাস না থাকলে অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ বিবেচনায় প্রার্থনা করলে সে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত করার আদেশ করেছেন।

আর দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, সমস্ত ছোট-বড় গুনাহের জন্য আল্লাহ্‌ পাকের নিকট তওবা করে তার দরবারে আত্মসমর্পণ করা। অতএব, দোয়া কবুল হওয়ার জন্য গুনাহ ত্যাগ করে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা উচিত। প্রার্থনা করেই ফলাফলের আশায় বসে থাকলে চলবে না। বরং ঐ লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাই কেউ যদি প্রার্থনা করেই অলসভাবে বসে থাকে তাহলে আল্লাহ্ তার দোয়া কবুল করবেন না। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-

’নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদঃ ১১)

মহান রাব্বুল আলামিন সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী

আল্লাহ্‌ পাক সব জানেন, সব দেখেন এবং সবই শোনেন। তিনি জানেন মুমিনের জন্য কোনটি উত্তম এবং কোনটি ক্ষতিকর। হতে পারে আমরা আল্লাহর কাছে অনেক সময় যে জিনিস চাচ্ছি তা হয়তো আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। যেসব দোয়ার মধ্যে বান্দার কল্যাণ থাকেনা সেসব প্রার্থনা আল্লাহ্‌ তাআলা কবুল করেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত ও অমনোনীত উভয় বান্দাদের পার্থিব কল্যাণ দান করেন। কিন্তু আখেরাতের কল্যাণ শুধুমাত্র মনোনীত বান্দাদের দান করেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আপনার দোয়াকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য পূরণ না করে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য পুরস্কার হিসেবে জমা রাখছেন।

আল্লাহ যদি কাউকে ভালোবাসেন, তবে তাকে পরীক্ষা করেন। হতে পারে রাব্বুল আলামিন বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা দিয়ে আপনাকে পরীক্ষা করছেন। যার ফলে আপনার দোয়া কবুল হতে বেশী সময় লাগছে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আপনার দোয়া কবুল করিয়ে নিতে পারেন।

যাদের দোয়া কবুল হবে না

অনেক মানুষ আছে যাদের দোয়া কবুল হবে না বলে আল্লাহ্‌ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন। রাসুল (সা) বলেছেন-

’তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হয় না।’

  • পলায়নকারী দাস যে পর্যন্ত তার মালিকের কাছে ফিরে আসে না
  • যে মহিলা তার স্বামীর বিরাগ নিয়ে রাত কাটায় এবং
  • যে ইমামকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা পছন্দ করে না।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবার ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। কোরআন ও হাদীসের ওপর আমল করে সঠিকভাবে দোয়া করার তাওফিক দিন।

badhonmatrimony

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *